বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
প্যারেডবিহীন করোনাকালের হ্যালোইন উৎসব ;  তানিজা খানম জেরিন মনে পড়ে ফুলনদেবীর কথা ? “ রুখে দাও ধর্ষণ “ নিউইয়র্ক গভর্নরের সর্বোচ্চ সম্মান পেল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুবর্ণ “কবি সফিক আলম মেহেদী ও সঙ্গীত শিল্পীর শিরিন আক্তার চন্দনার বিয়ে” সকল গৌরবময় ইতিহাসের স্বাক্ষী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অন্য সবকিছুর মতো মার্কেটিংও অতিক্রম করছে সংকট সন্ধিক্ষণ লালমনিরহাটে ছাত্রী ধর্ষণের দায়ে মামলা লালমনিরহাটে মাটির নিচে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ বিমানের ধ্বংসাবশেষের উদ্ধার বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে ১৫ দিন ধরে নিখোঁজ বুড়িচংয়ের মরিয়ম ধর্ষণ প্রতিরোধে মৃত্যুদণ্ড ; অ্যান্টিবায়োটিকটি শক্ত হলেও কাজ হবে কি?
প্যারেডবিহীন করোনাকালের হ্যালোইন উৎসব ;  তানিজা খানম জেরিন

প্যারেডবিহীন করোনাকালের হ্যালোইন উৎসব ;  তানিজা খানম জেরিন

প্যারেডবিহীন করোনাকালের হ্যালোইন উৎসব ;  তানিজা খানম জেরিন

প্রতিবছর ৩১শে অক্টোবর সমগ্র আমেরিকায় মহাসাড়ম্বরে পালিত হয় হ্যালোইন উৎসব। এবছর করোনা সংক্রমণের ভয়ে সব অঙ্গ রাজ্যেই দৃষ্টিনন্দন ও বহুরূপী হ্যালোইনের প্যারেড উৎসব হবেনা এবং হ্যালোইন উৎসব ভার্চুয়াল করা সম্ভব নয় তবু কিছু কিছু অঙ্গরাজ্যে সীমিত আকারে সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৫০ জনের ছোট খাটো দল দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন রঙ বেরঙের পোষাক ও মুখোশ পড়ে রাস্তা প্রদক্ষিণ করবে এবং দর্শনীয় স্হানে ও পার্কে জড়িত হবে। উল্লেখ্য আমাদের নিউইয়র্কে প্রায় একমাইল লম্বা যে প্যারেডটি অনুষ্ঠিত হতো এবার করোনা সংক্রমণের ভয়ে দর্শনীয় বড় আকারের প্যারেডটি এবার অনুষ্ঠিত হবেনা। আরো উল্লেখ্য বিশ্বের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহ্যশালী নিউইয়র্কে যে প্যারেডটি ওয়েষ্ট ভিলেজে অনুষ্ঠিত হতো যেটা প্রতিবছর শুরু হতো সিক্স এভিনিউ এবং স্প্রিং স্ট্রিট থেকে প্রায় একমাইল লম্বা প্যারেডটি গিয়ে শেষ হতো টুয়েন্টি থ্রি স্ট্রিট ও সিক্স এভিনিউয়ের কর্ণারে। বার্ষিক হ্যালোইন প্যারেড দেখার জন্য প্রতিবছরই চার থেকে পাঁচ মিলিয়ন দর্শক উপস্হিত থাকতো এবং বিশ্বের বহু দেশ থেকে পর্যটকরা আসতো দৃষ্টিনন্দন হ্যালোইন প্যারেড দেখার জন্য। হ্যালোইন প্যারেডের পরও বিভিন্ন দল বা গ্রুপ ইউনিয়ন স্কয়ার ও টাইমস্ স্কয়ারে বিভিন্ন শারিরীক কসরত প্রদর্শন করতো।

আমার দু:খ হচ্ছে এবার করোনা সঙ্কটের কারণে আমার পঁচিশতম হ্যালোইন প্যারেডটি দেখতে পারবোনা। গত দুই যুগ আগে সদ্য আমেরিকা আসার কিছুদিন পরই আমার প্রথম দেখা হ্যালোইন উৎসবটির ভীতিবিহ্বল স্মৃতি আজো মনে পড়ে।
উল্লেখ্য সেবার আমরা প্রচণ্ড ভীড়ের জন্য প্যারেড শুরুর ওয়েষ্ট ফোর স্ট্রিট পর্যন্ত যেতে পারিনি বাধ্য হয়ে আমাদেরকে ফোরটিন স্ট্রিট ও সিক্স এভিনিউর কর্ণারে দাড়িয়ে প্যারেডটি দেখতে হয়েছিল। ছোট বেলায় ভূত, প্রেত, রাক্ষস, দৈত্য ও পরীর অনেক গল্প পড়েছি ও শুনেছি কিন্তু বাস্তবে নিউইয়র্কের হ্যালোইন উৎসবের প্যারেডে উপরোক্ত গুলি দেখে আমি অনেক ভয় ও আনন্দ দুটোই পেয়েছিলাম মনে পড়ে; কিম্ভুতকিমাকার ভূত,প্রেত, দৈত্য, দানব দেখে দুই/তিন রাত ঘুমোতে পারিনি। নিউইয়র্কের হ্যালোইন প্যারেডে সুবিধামত দুই/তিন বছর অন্তর অবশ্যই যাই; এখন যেতে হয় ছেলে-মেয়ের আনন্দের জন্য বাধ্য হয়ে। যদিও ছেলে-মেয়েরা নতুন হ্যালোইন কস্টিউম পড়ে ক্যান্ডি সংগ্রহতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এতো লোকের ভীড়ের মধ্যে তাদেরও প্যারেডে যেতে অনীহা। এবারের করোনা পরিস্হিতিতে কস্টিউম পড়ার পরও মাস্ক লাগিয়ে ক্যান্ডি সংগ্রহ করতে হবে সবাইকে। স্মর্তব্য আইরিশ বংশোদ্ভুত ও ব্রিটিশ অভিবাসীরা ১৯শতকের শুরুতে আমেরিকায় হ্যালোইন উৎসবটির সূচনা করে। হ্যালোইন শব্দের অর্থ হল হ্যালোজ’ ইভ, বা অল সেইন্টস ইভ,এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে পরিচিত এই বার্ষিক ছুটির দিনটি মৃত সাধু, শহীদ এবং সমস্ত বিশ্বস্ত বিশ্বাসীদের স্মরণে এক ভোজেৎসোবের মাধ্যমে পালন করে থাকেন। আমেরিকায় হ্যালোইন অনেকটা গল্পনির্ভর সাংস্কৃতিক উৎসবের মতো।

ছোট বেলায় আমরা গ্রাম দেশে পাটখড়িতে আগুন লাগিয়ে “বালা আয়ে বূরা যা মশা মাছির মুখ পোড়া যা” এই শ্লোগানে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করতাম এবং অনেক বাড়ীতেই ভূত প্রেতের চেহারা সহ হাড়িখোল ও ঝাড়ু লটকানো থাকতো অনেক ফলবর্তী গাছে এবং ফসলের মাঠে দেখতে পেতাম কাকতাড়ুয়া দাড়িয়ে আছে। কিন্তু উত্তর আমেরিকা সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আমাদের গ্রামীণ উৎসবটির দেখা পাই হ্যালোইন রূপে ও ভিন্ন ধাঁচে। আয়ারল্যান্ড ও বৃটিশ অভিবাসীদের হাত ধরে উনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া হ্যালোইন উৎসবের প্রধান আকর্ষন হল মিষ্টিকুমডো বা পামকিন। হ্যালোইন উৎসবের দুই/তিন মাস পূর্ব থেকেই হ্যালোইনের কস্টিউম বিক্রি শুরু হয় এবং বৃটেনে প্রায় তিন হাজার কোটি আর আমেরিকায় প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের কস্টিউম বিক্রি হয় এবং বিশ্বে সর্বসাকূল্যে হ্যালোইন উপলক্ষে প্রায় দশ হাজার কোটি ডলারের কস্টিউম বিক্রি হয়। সারা বিশ্বে হ্যালোইন উপলক্ষে প্রায় তিনহাজার কোটি ডলারের ক্যান্ডি বিক্রি হয়। প্রতিবছর ৩১শে অক্টোবর হ্যালোইনের দিন কমবয়সী ছেলে-মেয়েরা বেড়িয়ে পরে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ করার জন্য এবং দোকানে দোকানে ঘুরে সংগ্রহ করে তিন/চার পাউন্ড ক্যান্ডি। হ্যালোইন প্যারেডে সাধারণতঃ ডাইনি, জলদস্যূ, ভ্যাম্পায়ার, জম্বি, ব্যাটসম্যান, স্পাইডারম্যান, রাজকুমারি, প্রজাপ্রতি, ব্যাটগার্ল, সুপারগার্ল, ওয়ান্ডারওম্যান, লায়ন, পেঙ্গুইন সহ হরেক রকমের নানা অদ্ভুত চিত্র -বিচিত্র পোশাক ও মুখোশ পরে সবাই অংশ গ্রহণ করে।

হ্যালোইন উপলক্ষে যেমন কস্টিউম বেচাকেনার ধূম পড়ে এবং ক্যান্ডি বিক্রি হয় টনের টন এবার করোনা সঙ্কটের জন্য বেচা-কেনা অর্ধেক হবার সম্ভাবনাও নেই। হ্যালোইন নিয়ে অনেক গান কবিতা ও নাটক আছে তেমনই হ্যালোইন নিয়ে প্রতিবছরই দুই/তিনটা সিনেমাও নির্মিত হয়। করোনা সঙ্কটের কারণে এখন পর্যন্ত হল গুলি বন্ধ থাকাতে হ্যালোইনের কোন ছবিও দর্শকরা হলে গিয়ে দেখতে পারবেনা। এই করোনা সঙ্কট বিশ্বব্যাপী সবাই মুখোশধারী; হয়তো এই হ্যালোইন উপলক্ষে বাজারে আসবে নানা বর্ণের আকর্ষনীয় কিছু মুখোশ, মাকড়সার জালে প্যাচানো কংকালের মুখে থাকবে হয়তো একটি নতুন ধরনের মুখোশ এবং বাড়ীর সামনে রাখা প্রতিটা পামকিনের গায়ে আঁকা থাকবে একটি মুখোশ। আমেরিকার প্রায় সব স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকাতে আমেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে হবেনা এবার হ্যালোইন পার্টি ও প্যারেড। এবছর অদৃশ্য শত্রু করোনা ভাইরাসের হাতে এখনও জিম্মি নিউইয়র্ক শহর তাই ভয় নেই হ্যালোইনের রাতে নিউইয়র্ক শহর ভূতের দখলে যাওয়ার ! এবার মাইকেল জ্যাকসনের গানের সঙ্গে নেচে-গেয়ে হেসে-খেলে হবেনা কোন আনন্দ উৎসব; দেখা পাবোনা চার্লি চ্যাপলিন ও আব্রাহাম লিংকনের প্রেতাত্বারও ; হয়তো দেখা মিলবে ট্রাম্প ও বাইডেন হেঁটে যাচ্ছে কোন রাস্তা দিয়ে। অশুভ শক্তির হাত থেকে বিশ্ব ও মানব জাতিকে রক্ষার নিমিত্তে যে উৎসব যার মর্মার্থ শোধিত সন্ধ্যা বা পবিত্র সন্ধ্যা এইবার করোনা সঙ্কটে সাড়ম্বরে বা অনাড়ম্বর যেভাবেই পালিত হোক না কেন হ্যালোইন উৎসবে সমগ্র মানব জাতির প্রার্থনা হোক একটাই – অদৃশ্য শত্রু করোনা মুক্ত আগামী বিশ্ব।

তানিজা খানম জেরিন
লেখক ও কলামিষ্ট
নিউইয়র্ক

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বসত্ব ® দেশের সময়.কম কর্তৃক সংরক্ষিত।